মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৫

আমার হারানো কৈশোরকাল

যতটুকু মনে পড়ে,
আসলে যতটুকু মনে রাখতে চেয়েছি আর কি…
তখন আমি সদ্য প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্ব শেষ করে
উচ্চবিদ্যালয়ের গণ্ডিবদ্ধ হবো—
সে কি উচ্ছ্বাস ছিল অন্তরে!
বলে বোঝানো মুশকিল লেখ্য ভাষাতে…

আমার অত মনে নেই,
তবে মা প্রায়শই বলেন—
আমার শৈশব থেকেই কেমন বিদ্যালয়ে যাওয়ার একটা ঝোঁক ছিল দারুণ রকম,
কিন্তু পাঁচ বছর ছাড়া তো ভর্তি হয় না,
তাই ছাড়পত্র মেলেনি।
আর তখন দাদা-দিদিরা নিজেদের আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে নিয়ে যেতে চাননি,
পড়ে পড়ে কেঁদেছি সেসব দিন…
সত্যিই তো— উচ্চবিদ্যালয় মানেই উচ্চবিলাসী জীবনযাত্রা।

আমি যখন আমাদের নিকটস্থ হাইস্কুলে ভর্তি হলাম পঞ্চম শ্রেণীতে,
গ্রামাঞ্চলের বহু পরিচিত মুখ তো তখন,
তাই কখনো একাকিত্ব ঘিরে ধরেনি।
হ্যাঁ, অনেক বন্ধু-বান্ধব,
ঠিক যতটা স্তরে পৌঁছালে মানুষ ভাবতে শুরু করে একে ওকে ‘বেস্টফ্রেন্ড’—
আসলে সময়ের ধারাবাহিকতায় সবই তো মূর্ছা যায়,
সে হোক না বন্ধু-শত্রু-স্বজন-পরিজন…

আমার চারটি বসন্ত পেরিয়েছে ওখানে—
কত ঝড়-ঝঞ্ঝা আর উত্থান-পতনে!
আমি প্রায়শই শুনতাম,
হয়তো বিশ্বাস হয়ে ওঠেনি না দেখা চাক্ষুষ প্রমাণে।
কিন্তু এখন বুঝতে পারি, বুঝতে শিখেছি—
হাড় যত ক্ষয় হয়, মানুষ বুঝতে শেখে,
বুঝতে বাধ্য হয়,
প্রকৃতি বাধ্য করে…
এক কথাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কত রকমে বলা যায়!

শিক্ষক-শিক্ষিকারা খ্যাতিতে চেনে,
ব্যক্তিগত দিক থেকে মুখগুলো অচেনা—
আসলে কেউ চেনে,
কেউ আবার চিনেও না চেনার ভান করে,
মানে চিনতে চায় না আর কি…

আমার অভিজ্ঞতা অজস্র—
বর্ণনা দিলে সমুদ্রসমান।
ক্ষত ভুলে থাকাই ভালো।
তাই এখনও কখনো
সময় অসময়ে পেরিয়ে যাই ওপথেই,
শুধু দেখি—
দাঁড়িয়ে আছে নির্মাণ,
দু’হাত বাড়িয়ে,
প্রাণ নেই আঙ্গিনায়…

চিতাভস্ম ঘুরে ফিরে দেখে কেউ কেউ—
এখনও কি কিছু বাকি আছে?
সব শেষেও কি ফেরে যায় শুরুতে?
বিহারে যদি নালন্দা ফেরে,
আমরাও ফিরবো সগৌরবে…

রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৫

আবাস

কখনও হয়তো 
একান্নবর্তী পরিবার ছিল
অতীতে
এখন একক সব
নিজ সুবিধা ও স্বার্থে…

সঙ্গে থাকলে
পেট ভরে খুশিতে
চোখ কোণে তখন ঈর্ষে 
বাটোয়ারা
কম-বেশী ভাগাভাগিতে
ফসল ভালো হলে
আগাছা বেশী জন্মে…

বিভাজিত হয়ে গেল 
পরিবার
পূর্ব-পশ্চিমে
ভাইয়েই তখন চেনেনা ভাইরে
কী অদ্ভুত হায়রে!

বোঝা তখন বুড়ো-বুড়ি
ছেলে যদি থাকে দুই 
কিংবা ততোধিক 
এবং থাকে
মেয়ে আরও
সবাই শুধু চেয়ে থাকে
ওরা যেদিন চলে যাবে
ধরণীর ওপারে
দখল করবো ওই জমিটারে
তারপর চলবে
কাড়াকাড়ি
অকথ্য আলাপ
ঘাত-প্রতিঘাত
পিতা-মাতা জানে না
ওরা যাদের জন্ম দেয়
মানুষ ভেবে
ওরা রূপ নেয় 
অন্যরূপ
ভোল বদলায় বড়ো হলে

যারে ডাকিনি কখনো আদরে
বেঁচে থাকতে সদরে
শেষকালে কেন বারি ঝরে!
গিন্নি এলে পরিবারে
কোনো আবাস গড়ে ওঠে
মহলে
উঠোন ভরে খুশিতে
কোনো পরিবার 
আবার হারিয়ে যায়
কক্ষপথ থেকে 
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে…

শনিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৫

লড়াই

বাড়ীতে পুষেছি পায়রা
কিছু
তাদের তরে যখন ছড়াই
শস্যদানা
আমি একদৃষ্টে চেয়ে থাকি
দেখি ছিনিয়ে নেওয়া
লড়াই

কেউ কেউ গিলে ফেলে
একের পর এক
দানা
কেউ আবার তুলতেই পারে না
এক দানাও
শুধু দেখে 
চোখের কাছে
অভুক্ত উদর 
ঠিক কেমন হয়
দেখে শিখি ওদের কাছে…

এ বাড়ী নিজের 
তবুও 
প্রতিযোগিতা ভীষণ
এখানেই
তাই মনিবকে ফাঁকি দিয়ে
ওরা যায় প্রতিবেশীর উঠোনে
পেটের টানে…

যাদের জন্য করি হৃদয় দান
তারা কি মনে রাখবে আমায়
যদি তারা জেতে প্রতিযোগিতায় 
আমি হেরে যাই…

বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫

বাঁদনা পরব -- হামদের গরব হামদের রিজ


বছরের পর 
                   বছর ফিরে
                           যখন শ্যামা
গৃহে ফেরে
                  উথলে উঠে
পরাণ হামদের …


    গোয়াল পূজা
                               শালুক ফুলে
                                গরুদের চুমাই
                             ধানশিষের মোড়ে  
      সারা শরীরে ছাপ 
                                 রঙ-বেরঙে
                       পেঁপেকে কেটে ফুল আকারে
                                          আতিথেয়তা আরো
 পিঠে মুখে ভরে
                              আরো চাই         
মুখে বলতে না পেরে
‌ সোজা চলে আসে তেড়ে
    হামদের পরব 
                              গাঁ-ডহরে
 গরু খুটানে
                            ভেলকি দেখিয়ে

     

  
ঝুমুর হাঁকিয়ে
              মন-মাতিয়ে
                               মন হামদের টানে 
                      বারে বারে                          
                           ঘুরে কি পাবো নাই
                    ‌‌ হামদের রিজ
        হামদের ফুর্তিগিলাকে 
                                  ফিরে …

মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫

মিঠাই

কারো জীবনে খুশির স্রোত এলে
চরাচরে যারা থাকে
ভাগ পায় মিষ্টি মুখের

আমি ও ভাই চেয়ে থাকি
অপেক্ষায়
বাবা কখনও হাটে কিংবা বাজারে গেলে
ফিরে এলেই থলি হাতড়াই
খুঁজি,
“কী মিঠাই এনেছো আজ?”
কখনো পেয়েছি 
জিলিপি, কখনো খাজা
কখনও আবার গজা
তরতাজা

কখনো আবার হয়েছি নিরাশ 
হাতড়াতে গিয়ে
বাবা বলে, “ভালো হাট হয়নি আজ
আর মিষ্টি আনবো কী করে”
বাবাও হয়তো কাঁদে কখনো
আমাদের কাছে জল লুকোয়
অভাবটা ব্যক্তিগত
তার ছোঁয়া লাগতে দেয়নি
আমাদের এখনও…
কখনও বকেছে বিরিক্তিতে
আবারও কখনো হাসিমুখে মজাকে
“তোরা এত বড়ো হলি
তবুও তোদের মিষ্টি চাই”
বাবাকে বলতে চাই
বলতে গিয়ে থেমে যাই
মিঠাইয়ে অভ্যস্থ 
                 এমনই
প্রথাগত অনুবর্তনে
পাভলভের
কুকুর হয়েছি উদ্দীপনায়
শব্দ কানে এলেই
তাই 
লালা ঝরে যায়

শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৫

বছর দশ-পনেরো পরে

হঠাৎ যদি 
সংসারের অস্থির পরিবেশ থেকে
মুক্ত হই কখনো
মুহুর্তের জন্য —
মনে পড়বে 
শৈশবের ক্রন্দন
কৈশোরের বদমায়েশি
যৌবনকালের
বন্ধুদের খুনসুটি…

আচ্ছা, ওরা এখন কোথায়
কী করে
বিয়ে করে নিয়েছে প্রায় সবাই
এ বয়সে
কেউ যে অবিবাহিত বা অবিবাহিতা রয়ে গেছে
যতদূর মনে হয় কেউই নেই
ক’জন যারা ডেকেছিল
মনে রেখেছিলো
কলেজ পরেও
তারপর সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে
হারিয়ে গেল সবাই
এমনকি আমিও…

এখন যোগাযোগের তালিকায়
সংযোজিত হয়েছে 
সহকর্মী
অর্থাৎ 
যাদের সঙ্গে আমি কাজ
করি
ও 
আত্মীয়স্বজন,
ছেলে-মেয়েদের টিউশন টিচার
আর
কয়েকটা বাছাই করা বন্ধুর
ফোন নাম্বার
অবসরে আড্ডা দিই
গিন্নির ঘেন্নায় নেশা করিনি
বন্ধুরা ডাকে —
“আয় না একদিন…”
ইচ্ছে করে
তবে কথা দিয়েছি যারে
বসি বটে
পারি না চুমুক দিতে…

সংসার সাজাতে সবাই ব্যস্ত
পথে-ঘাটে কত মানুষ
বন্ধুরাও তার মাঝে
ওদের মধ্যে পারি না 
বেছে নিতে
কারো মুখ চেনা
নাম নেই মস্তিষ্কতে
আমি চাই ওর চোখে
ও চায় আমাকে
চেনা-অচেনায়
তবুও আলাপ 
রয়ে যায় অধরাতে
বন্ধুরা আজ পথের লোক
দুর্বল মস্তিষ্ক আর আঁখি পারেনি
নিজেদের শক্তি ধরে রাখিতে
এ পরাজয় কার?
বন্ধু-স্বজন
নাকি
আমার মতো আমাদের?

বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৫

প্রথম প্রেম

 তখন চাঁদ পেয়েছি হাতেলিতে
খুশিতে আটখানা জীবন
সময়ের পর সময়
গিলেছি সব
যা গিলতে চাইনি হয়তো
 জ্ঞানে কোনোদিন
তবুও ভ্রমে…

একে অপরকে ছেড়ে থাকতাম বটে
তবে ছাড়তে পারতাম না
এই ভেবে –
যদি রোশনি ফেলে অতীতে
একটা মানুষ ঠিক কতটা নগ্ন
তা তার প্রেমিকা কিংবা অর্ধাঙ্গী জানে
সমস্ত প্রেম শেষ হয়
তৃষ্ণা মিটে গেলে
তবুও পারা হয়ে ওঠে না
মায়ায় 
আর রহস্যের বেড়াজালে…

যারে চিনিয়েছি ঠিকানা
যারে দেখিয়েছি প্রতি কোণা
যে জানে গোপন কোমরাখানা 
যে জানে অসুখের কথা
যার কাছে খবর আছে –
উন্মাদনায় আমার ভাষা
আমি খোলা বই
তার কাছে
প্রেম শেষে 
প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা যেমন
দহন করে পত্র সামগ্রী
দাহ্য শেষে
পড়ে আছে আমার প্রেম
হাওয়ায় উড়ছে ছাই তার…

কাজের মাসী

কখনো এ বাড়ী
কখনো আবার ও বাড়ী
দেখাশোনার দায়িত্ব বইকি…
যারা ওদের এনেছিলো
দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে
ভাতে-কাপড়ে সুখে রাখার
প্রতিশ্রুতি দিয়ে 
তারা হাত তুলে দিয়েছে আজ
আত্মসমর্পণ করে
পুরুষের যা দায়িত্ব
তার অর্ধাংশই নারী 
পালন করে…

কারো বাড়ী থাকি সারা বেলা
কারো কারো বাড়ীতে
শুধুই সময় সময়ে যাওয়া ফেরা
কেউ বোঝে মজবুরি
দেয় সঠিক মজুরি
কেউ আবার শর্ত রাখে
এমনই
যেন আমি বিক্রিত পণ্য
ক্রয় করেছে ভোগের লাগি
কত যাতনা কত জ্বালা
কাদের বোঝালে
হবে ফয়সালা?
বিচার করবে তো তারাই
যারা বড়ো মানুষ
দাদা! দাদা! করে ডাকি যাদের
রোজ
এসব সব ছোঁয়াচে অসুখ
ছড়িয়ে যায় সহজেই
স্বামী বলে, “মাগী শরীর বেচিস
তোর অভাব এমনই!”
আমার নাগরকে বোঝাই ক্যামনে
সে যদি খাটতো আজ
তার বলে
হয়তো এমন দুর্দিন হতনে…

কেউ ডাকে নামে
কেউ ডাকে বৌদি
কেউ আবার মাসিমা নামে
আমার বুক ভরে ওঠে স্নেহে
আমার মনেই হয়নি 
কাজের লোক
কেউ কেউ আগলেছে এমন
মনে হয় পরিবার
এমনই তো হয়
ছোটোতে বিবাহপূর্ব কল্পনায়
এঁকেছিলাম এমনই ছবি
বাস্তবে তারই দেখেছি বিপরীত
প্রতিচ্ছবি
স্বামীর মুখ দেখে নয়
সন্তানের মুখ চেয়ে
আমি রয়েছি ওই পরিবারে
অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে…
আক্ষেপ করি না
উপেক্ষা করি
বেঁচে নেবো সেভাবেই
যেভাবে বাঁচবে পৃথিবী…

মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫

ত্রিকোণ


                                 ১
উঠে পড়েছি নৌকায়
দিক জানি না …
যাচ্ছি সেদিকেই 
যেদিকে মাঝি
আর স্রোত নিয়ে যায়
বঞ্চনা’র থেকে 
যেটুকু পাওয়া যায়
ওটুকুই অনেক…
কখনো কেউ টেনেছে কাছে
আবার ফেলেছে মাঝ দরিয়াতে
দিকভ্রান্তি হলেই বুঝি
মানুষের খিদে পায়
চেতনাদয় হলে আবার
পূর্বে রূপে ফিরে যায়
হে বিধি, 
আমি কোন কিনারায়?

কখনো অতীতকে শ্বাসরোধ করতে
কিংবা স্রোতে ভাসতে ভাসতে
আমি খুইয়েছি আমাকে
দীর্ঘদিন সাগরিকা’য় পড়ে থাকলে
ভালোবাসা জন্মাবে না
কোন অজুহাতে?
আমার খামখেয়ালী মেজাজ
বারে বারে ডাকে পশ্চাতে
খুশি হই
আবার ডুবে যাই শোকে
তুই চলে যা ওর সাথে
আমার পরাণ জুড়াবে 
তবে
পেলাম না তোকে
এ ধরাতে 
ছন্দ মেলাতে চেয়েও 
পারিনি মেলাতে
তুই ওর সঙ্গেই বেঁধেনে ঘর
আমার প্রার্থনা বিধির নিকটে…


তোর সঙ্গে ঘোরাফেরা
একই শহরে বসবাস করা
ভালো না লাগিয়ে পারা যায়!
মাঝে মাঝে ওঠে রব
হৃদয়ে নাকি বাসা বাঁধছে 
শুনেছি কোনো পোকা-মাকড়
হিংসেতে জ্বলে হিয়া
জ্বরে পুড়ে আমার শহর
শয়তান সব
পৃথিবীর জরা
যার চাই আমি ধরা
জনতা জো পেলে হয়
ছাড়ে না নরকখেকোরা
তবে ওরা জানে-জানেনা
রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ ফুটছে বিজয়…

বন্ধু

ওরা 
যারা বাঁচতে শেখায়,
মরণমুখী হলে আবার লাথিতে দু'পা এগিয়ে দেয়…

পিতৃ ভিটের বাইরে
এক অন্য জমিন,
অন্য পরিবার,
যেথা মনে খুলে হাসা যায়,
নিঃশব্দ কান্নাও যেথা অর্থবহ…
রতনে রতন চেনে,
এভাবেই গড়ে ওঠে প্রাণ,
ভাবনার মিলনেই তো বন্ধু-স্বজন।

বন্ধুর অস্তিত্ব থাকে,
শুধু মরচে ধরে বন্ধুত্বে একদিন,
চেনাজাত অচেনা হয়,
প্রয়োজন শেষে কে কথা কয়,
কে-ই-বা রাখে যোগাযোগ!
যারা কথা দেয়,
আছি,
থাকবো,
বিয়েতে ডাকবি,
খোঁজ
নেওয়া মানুষগুলোই
একদিন নিখোঁজের তালিকায়।

স্টেশন

ওই দেখা-র
শুরু 
শেষ …
পলকেই কে কখন হারিয়ে যায়,
খোঁজ তো থাকে অবিরত…
এক ছায়া-কে মাড়িয়ে যায় অন্য ছায়া,
প্রতিবিম্ব দাবি করে সম্মুখের।

নুড়ি-পাথর

পথের ধারে কিংবা সৈকতের তীরে
কখনো যখন গয়না বা মুক্ত ঝরে
কত পরশ তখন
কত স্নেহ-আদরে
আগলে ধরে বারে বারে…

বিস্তৃত সাগর আর দিগন্ত মাঠ
মধ্যভাগ চেরা রাস্তা
ওতে হারিয়ে গেছে সব আগেই,
তবুও খুঁজি রোজ পথের ধারে
কিংবা সৈকতের তীরে
সময়ে অসময়ে অবসরে
হিসেবের খাতায় হিসেব মেলে না…

রাষ্ট্র শুধু স্বপ্ন দেখায়
যেমন দেখে কোনো বাঁজা জাতি
ফসলে ভরেছে 
আঙিনা আর বাগান বাড়ীটি…

ফুল ফোটে
সুবাসে ঢেকে যায় গোটা শহর
কানে কানে পৌঁছায় খবর
সব ফুলের গন্ধই শুঁকেছি
এ ফুল বৈচিত্র্যময়
এর নামটি আমি কেন গোটা শহর
জানেনি…
খুঁজেছি এর উত্থান
দেখেছি
পর পর মৃতদেহ
তার উপরে ফুটে আছে ফুল
ফু্লের গন্ধে উতলা আকাশ
পচা-গলার গন্ধ নাকে আসে না।

ডিনামাইট শেষ করে দেয় 
এক একটা পার্বত্যাঞ্চল
জন্ম নেয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নুড়িপাথর…

বিদায় বেলা

কত কথা বলার,
তবুও নিঃস্ব হয়ে তাকিয়ে আছি,
নিস্তব্ধতায়।

কোন যৌক্তিকতায় বোঝাবো
আবেগের ভাষা,
চেনা মানুষ সত্যিই কি গা ঢাকা দেবে
ওই অচেনা ভীড়ে!

কে চেনাবে আমাদের 
আসলে গোলাপ কোনটা,
কে-ই-বা জিজ্ঞেস করবে ওভাবে আমরা চা খাই কি না…
কে শেখাবে আমাদের চাষবাস,
কে শেখাবে প্রকৃত অর্থে শিক্ষকতা?

সত্যি, ভাবিনি কখনো 
ওই ফাঁকিবাজ মানুষটা
শিক্ষা দিতেও জানে…

গল্প শুনতে ভালোবাসি বলেই
হয়তো আজ প্রিয়,
তবে এমন গল্পকথক মিলবে কি আর!

একঘেয়েমি শ্রেণীকক্ষে ওই টুকু নিস্তার,
আমাদের ধরেই নেওয়া গল্পের ক্লাস,
স্বস্তির নিঃশ্বাস…

সত্যি! বিশ্বাস হয় না এখন,
ওই এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকা মানুষটা আর ক্লাসে আসবেন না!

বিবর্ণ ইতিহাস

আমাকে দাদু-ঠাম্মা মা-বাবার গল্প শোনায়নি
যেমন শোনার সৌভাগ্য হয়
কারো কারো
যতটা শুনেছি মা-বাবার কাছেই,
তাদের ভালোবাসা বুঝি
আমাকে আগলে রাখা দেখে…
যেদিন আমি মেয়ের পেটে
নিরাপদে
শেষ দিন
তারপর আলো দেখবো পৃথিবী-র
কত উচ্ছ্বাস গর্ভভরে…
মা’র কী না কষ্ট হয়েছে সেদিন
কারণ সমস্ত অধিকার ছিন্ন তার
আবার নিঃসঙ্গ 
একলা
যারে পেটে ধরে রেখেছিলো
নয় মাস ধরে
অন্ধকারে
সস্নেহ ভরে
মা-ই জানে এ আলোর শহরে
অন্ধকার ঠিক কতটা গভীরে…

আমি কেমন ঠিক জানি না
কারো কারো কাছে তবে অসুস্থ প্রাণী
কারো কারো কাছে হয়তো থাকার চেয়ে না থাকা শ্রেয়
এ পৃথিবীটা কত রঙীন 
যারা দেখেনি কোনোদিন
আমরা জানি 
দেখি
অর্থাৎ দেখতে পাই দু’চোখ ভরে
কী কুৎসিত পৃথিবী
জরাগ্রস্ত সভ্যতা
কোন শব্দ সন্ধিতে বোঝাই তা!

মেয়ে হয়ে জন্মানো অভিশাপ নয়
তবে শারীরিক সুস্থতা কাম্য
ঠিক ওতে যদি হয় ব্যাঘাত লক্ষনীয়
ঘেঁষতে চায় না কেউ তো
ছোঁয়াচে রোগের মতো …

আমি নদীর মতো
ঢালে বয়ে যাই
ভালো-মন্দ চিনি না তাই
কোন বৈশিষ্ট্যের আধারে কাকে জড়াই!
ওরা যারা কাছে টানে 
প্রয়োজনে
ছুঁড়ে ফেলে সময় পেরোলে
তবুও আমি স্রোতে ভাসমান
কখনো পদ্ম
কখনো কচুরিপানা হয়ে
ভেসে যাই
সময়-স্রোত যেভাবে ভাসায়…

মূর্ছা যাওয়া মুখ

আমাদের আর তিলোত্তমা-অভয়া’র কথা মনে নেই,
যার জন্য দেখেছি কত মিছিল-আন্দোলন…
সব থেমে গেছে
আবেগের নিস্ফলনে।
ন্যায্য বিচার পেলো কি পরিবার!
এর সদুত্তর দেবে কে বা কারা?
প্রশ্ন রাখবো কার কাছে?

সঙ্গ যদিও মানুষ ক’দিনের দেয়,
যা হারালো তারা,
সে হারানোটা আসলেই নিজেদের…
আমরা যারা আশ্বাস দিই,
বিশ্বাস নেই নিজেদের ওপরই,
বাদশা-বেগমের পাশা খেলায়
আমরাই হারি বারে বারে…

ঘটনার পর ঘটনা সব
কবরে পড়লে কে রাখে খোঁজ…
দু’ফোঁটা অশ্রু গড়ালেই জানো
গড়ে ওঠে না মহাসাগর…
সম্মুখ পশ্চাতে ছুটছি শুধু
যেভাবে ছোটাচ্ছে সুলতানা-সুলতান,
গোলাম নামের গরব কীসে
যদি নাই রাখি তার মান…

ধম্ম-জাতি’র বিভাজনে আমাদের বড্ড চোখ,
তাই বারে বারে মানুষের এত বিভাজিকার প্রতি ঝোঁক।
সত্যি বললেই জ্বালা ভীষণ
টেনে আনবে শ্লীলতা
ওরে অবোধ!
যেটা যা ওটা যদি নাই বলি
সঙ্গমের বিকল্পে কিংবা বিনা বীর্যপাতে
তুই সন্তান সৃষ্টি করে দেখা…
ওরা জানে সব
লিখে না কেউ
“লিখলে ওর চেয়েও ভালো লিখতে পারি,
যা দেখছি, দেখছে সবাই,
ওই নিয়ে কেন এত লেখালেখি?”
লিখলেই তো মানুষ জানবে
ভালো সেজে থাকতে হবে
কে জানে নয়তো কবে কী হবে
ঠাঁই হবে কারাগারে
পাশের বন্ধুই কে জানে কবে
প্রতারক রূপে ধরা দেবে
কর্ণে আসুক সহস্র কথা
অক্ষিটারে কে বোঝাবে!?

তোদের যত আলমারি আছে
ভালোগুলো সাজিয়ে রাখ
রাজা-রাণীর তোরা চিরকাল
এভাবেই নোকর থাক…

ভোট পরব

বেঁচে আছি,
খাচ্ছি-পরছি,
সবই তাঁদের দান!
মানুষরূপী ভগবান…!

রাম-বাম-শ্যাম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ,
রামপদ বলেছে, ভোট দিলে দেবে বাড়ী,
বামাপদ বলেছে, পাশে দাঁড়ালে দেবে চাকুরী,
শ্যামপদ’র কথায় জয়যুক্ত হলে, বিনামূল্যে রেশন ভুরিভুরি…
হতবাক জনতা,
সব'কটাই চাই,
কাকে ভোট দিই?!

পাঁচ বছরে একবার ব্লাড ডোনেশন,
তারপর প্যাঁচ-পাঁচটি বছর রক্ত-শোষণ,
এক থেকে অন্যের স্থানান্তর,
মুঠোফোনে রিভার্স চার্জিং…
শত্রুও আজ বন্ধু-দ্বারে,
ভাই জানিস তো, আমরা তোদের তরে…
কথা দিচ্ছি,
স্বচ্ছ সমাজ গড়বো,
তোর ওই খসখসে চামড়াও ট্রান্সপ্ল্যান্টে মসৃণ করে দেবো…
কথা রইবে শুধু,
কইবে না আর।

ছিনাল

বড্ড ইচ্ছে করে বদলাই,
তবে একঘেয়েমি লাগে একে…
পতিতাবৃত্তি অনন্য এক সুখ,
বোঝানো যায় না লেখ্য কিংবা মৌখিক ভাষাতে…

কত ঠোঁট, কত দাঁত, 
এমনকি জিহ্বা, ত্বক
স্বাদ নিয়েছে আমাকে এবং আমার লালারসের…

কেউ কেউ ছিল এমনও, 
যারা শুষে নিতে চেয়েছিল আমাকে,
মদের গ্লাসে যেমন মত্ত মাতাল 
শেষ ফোঁটাও না ছাড়ে,
আমাকেও কেউ কেউ জড়িয়ে ছিল এভাবেই…

তবে আমরা বেশ্যা,
শরীর নিয়ে ব্যবসা আমাদের।
মন মরে গেছে কবেই,
তাই প্রেম জন্মায় না হৃদয়ে…

কত ধরণের গ্রাহক রোজ,
কেউ গতিতে দ্রুততম কেউবা অতিমন্থর,
কারও কারও বিরক্তি যত কিংবা জমানো ক্ষোভ,
কেউবা আবার বেদনাপূর্ণ বেদুইন,
সকলের আঘাত সয়েছি শয্যায়,
চোখে জল আসে,
তবুও দাঁতে দাঁত চেপে তৃপ্তি দিয়েছি ওদের…

অর্থের বিনিময়ে শরীরের সম্ভার,
শরীরের সংখ্যাসম মনও
তবুও ওরা মনখানি বেচতে না চায়…
ওরা কয়, “আমরা পতিতা,
শরীর বেচি,
মন না।”

যা বলতে পারিনি

ইচ্ছে ছিলো
তোমাকে না পাই
তবুও হাতখানি জড়িয়ে ধরে 
বেঁচে থাকবো 
কোনো কিনারায়…

ঈশ্বর তো বধির,
যারে পূজিতেছি
সে পাথর 
ভ্রমে বুঝেছিনু 
নিরাকার-অদৃশ্য 
ঈশ্বর,
নেই তবুও আছে
হয়তো এমনই বিশ্বাসে
আজ নিঃশ্বাস আটকে গেছে…

সখী, 
তোমায় কী দেখালে ভুলিবে 
আজীবন 
সঙ্গ দেবে আমার ছায়াপথে
ভাসিবে আমার স্রোতে 
জীবনকাল…

বলতে চেয়েছিলাম 
বহু কিছু 
এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের দেখা আর কথোপকথনে তা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি…
যখনই গিয়েছি কাছে
তোমার নিঃশ্বাস 
আমি নিয়েছি শ্বাসে 
স্তব্ধ হৃদয় ছুটেছে বেগে…

ইচ্ছে ছিলো 
আরও কত কী বলার
এখন বলা যায় না 
বলতে চাই আবেগে
বাধা দেয় বিবেক…

ছোঁয়ার নাগালে নাইবা পাই
তবুও অন্তর ছোঁয়ার লাগি 
ব্যাকুল আমি
বাধা হয়তো দেবে তুমি
আত্মাও পাবে না ঠাঁই,
তবুও তোমায় ছুঁতে না পাই
হৃদয় ছুঁতে চাওয়া কি অন্যায়…!

গন্তব্য

ওরাকে পাশে পেয়ে
জড়িয়ে ধরে
স্মৃতির কাদা ঘেটেছি…
তখন কে জানে অত কথা
যত কথা আজ জেনেছি…

ঘুড়ি উড়তে ভালোবাসে
তাই আমরা ওড়াই
উড়তে উড়তে মধ্য গগনে
নানা ঝঞ্ঝার আগমনে
লাটাই ঠিক থাকে হাতে
সুতো ছিঁড়ে যায়…
তারপর দিশেহারা
ঝড় যেথা থামে
সাহারা…

ওরা কাছে আসে
ভাগ নেয়
তারপর বেদখল…
ওরা আঁকতে শেখায়
লিখতে শেখায়
শিখে গেলেই ছিনিয়ে নেয়
বই-খাতা…

ক্ষনিকের উত্তেজনায় ওরা কাছে টানে
তারপর ঠেলে দেয়
অন্ধকার মুখে 
জননী এমনও সন্তান
কি পৃথিবীতে প্রসব করেছে?

যাদের জানি
তাদের আসলেই অজানা অনেক
চিনি তো ওইটুকু
যতটুকু চিনি লবণের…
আমরা শুধু চিনি
জানিনা
আরো অনেকেই
অন্ধকারে 
তাই
একই জায়গায় আজও
হাতড়াতে গিয়ে
বুঝি অন্য জায়গায়…

বোকা লোক

ওরা জানে সব
তবুও বোবা হয়
বোকা সাজাই আমরা…

ওরা জানে
যাকে ওরা বড় করছে তিলে তিলে
সে-ই একদিনে শেষ করে দেবে 
সব
বিষাক্ত দংশনে…

তবুও তাঁরা স্বপ্ন দেখে
আমার সন্তান ওই যে
শত নক্ষত্র ভিড়ে…
জন্মদাতা’র পরিচয় শেষ
সন্তান পায়ে দাঁড়ালে।

ওরা বোকা লোক –
যারা আমাদের আলো দিয়ে
নিজেদের আঁধারে রেখেছে,
যারা নিজেরা না খেয়ে আমাদের খাইয়েছে,
যারা নিজেরা এক পোশাকে থেকে
আমাদের জোড়া জোড়া পোশাক দিয়েছে,
ওরা প্রত্যেকে বোকা লোক
যাদের আমরা বোকা বানাই প্রতিনিয়ত।

অগ্নিসংযোগের আগে

সহজ সরল দিনগুলো কেটে গেছে বহু আগেই,
আমি জানলাম 
ভ্যানিটি ব্যাগটি তুলে নিয়ে
তাতে ছিল টাকা-কড়ি
আর ছিল কয়েকটি মলিন ছবি …

হ্যাঁ, ছবিগুলো মলিন,
তবে স্মৃতি এখনও তরতাজা,
স্বামীকে আজও জড়িয়ে মনে হয়
হয়তো জড়িয়ে ধরেছি
তাঁকেই 
যারে বুনেছি স্বপ্নে নিত্যরাত্রী…

 একসময় যারে নিয়ে গড়েছি 
মায়ার সংসার,
আকাশের পানে তাকিয়ে ঠিক করেছিলাম 
গর্ভে ধরবো সন্তান তোমার…
আজ সন্তান সম্ভবা,
তবে পিতা অন্য কেউ
তুমি নও…
খুশি!
তবে খারাপ লাগা এটুকুই…

আমার এখনও মনে আসে
যখন একাকি বসে থাকি 
চায়ের পেয়ালা হাতে
জন্মদিন এখনও আসে,
শুধু ওই হাতটিই আর আসে না সম্মুখে
যে কেক বাড়িয়ে দিয়েছিল একদিন 
কত আদর সোহাগে…

ওরা কি এমনই
স্বপ্ন দেখিয়ে
ভেঙ্গে দেয় খেলাঘর?
যারে গড়তে লেগেছিল
কত দিন-মাস-বৎসর…

মরণ ডাকে

পরিসংখ্যান প্রতিদিন 
প্রতিনিয়তই বলে
কেউ
চলে যায় আড়ালে 
কেউ আবার চলে আসে
আলো সম্মুখে
লুকোচুরি খেলা বটে
তবু কি লুকোনো যায়!

জন্মের পর
প্রতিনিয়ত
প্রতিটা দিন 
মরণ তাড়িয়ে বেড়ায়,
না, আমি যাবো না
যাওয়ার ইচ্ছে নেই
মরণের ডাক উপেক্ষা করলেই
হয় কি রেহাই?
টের পাবে 
কিংবা 
হয়তো পাবেও না কোনোদিন,
হারিয়ে যাবে তারার ভিড়ে
পড়ে রইবে ঋণ।

প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যখন মানুষ নয়,
ঈশ্বর কেন হবে?
তাই তো মরণ দাপিয়ে বেড়ায় 
শূন্যগর্ভ পূর্ণ করিবে বলে।
আমি যতই বলি যাবো না
তবুও একদিন চলে যেতে হবে
আমি যদি না যাই 
তারা আসিবে কীভাবে!

মরণ ডাকে
আমার যাওয়ার ইচ্ছে নেই
তবুও যেতে হবে
মৃত্যু যাতনা তবে বুঝি কমাবে!
বেঁচে থাকতে নয়তো তুমি
তাড়িয়ে তাড়িয়েই বেড়াবে!
তোমার ক্লান্তি নেই,
শুধু আমারই অবসন্ন মনে
ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যু চেতনা আসে
তবে কি চলে যাবো 
ঋণ রেখে
ধরণীর বুকে?
কোন প্রহরে তবে আমাকে ঠোঁটে-ঠোঁট 
রেখে 
মৃত্যু কেমন ভয়ানক
সে চিত্র দেখাবে!!

আঁধারে সভ্যতা

যে সংসারের মাঝে ‘মা’ একদিন দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়, 
তাঁকে নিয়ে মাতৃ দিবসে কত কথা, 
কত ভুয়সী প্রশংসা! 

দ্যাখ মা, তোর তো দুই ছেলে আর এক মেয়ে,
দেখ তুই কার কাছে থাকবি…
 তোর ওই জমি-জমা যদি আমায় লিখে দিস, আর মাসের শেষের ওই পেনসন যদি তুলে দিস আমার হাতে, 
তোর খেতে পরতে অসুবিধে হবেনে।

দু’দিনেই বলে দেবে গৃহিণী, 
ওদের সেবা করতে আমি তো এখানে আসিনি…
 
…এভাবেই কোনোদিন আট-নয় মাসে 
মায়ের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়েছিল সন্তান, 
আজ আবারও বিয়োগ… 
সোনার মানিক আজ পত্নী’র গোলাম।

বৃদ্ধাশ্রমে বুড়ো-বুড়ি, 
এই ছিল কপালের লিখনে!
না খেয়ে যারে খাওয়ানো, 
না পরে যারে পরানো,
প্রতিদানে ফসল ফললো এই!

কত স্বপ্ন ছিল, 
পড়িয়ে মানুষ করবো তাঁরে,
আজ চাকুরীরত, দেখে বুক চওড়া হয়…
শূন্য পেটে ছাতি কীভাবে ফোলে!

আমরা না পাই খেতে, 
তাঁরা তো পায়।
ওই হাসিতেই আমাদের পেট ফুলে ওঠে।
মানিক যা চেয়েছিল পেয়েছে, 
আমাদেরও চাওয়া ছিল ওইটুকুই।

ছোটোতে তাঁরে বলতাম, 
কি রে বড়ো হলে আমাদিগকে খেতে দিবি কি নে?
সেই জড়িয়ে ধরা কি আর ভোলা যায়!
তোমাদের না খাইয়ে খাবো কি করে…

আজ গিন্নি আছে…
বউমার চোখে আজ আমি ডাইনি,
আমি অশুভ, 
অভিশাপ…
আমি খেতে না পাই, 
তাঁরা পাওক।

কূটনীতি

বহির্বিশ্বে ব্যক্তি সাধারণ,
পথের দু’দশটা মানুষ যেমন…
মস্তিষ্কের অগ্র-পশ্চাদ
মোড়া কঠিন আবরণে
আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক চোখ 
ভেদ করতে ব্যর্থ
ওই জঞ্জাল…

তিনি দার্শনিক,
মনস্তত্ত্ববিদ,
রূপ জৌলুস কথা পরের,
কথার ভাঁজেই হারাতে পারেন
সে এমনই তান্ত্রিক…

মাটি খুঁড়ে জীবাশ্ম উদ্ধার সহজ,
শুধু ওকে খোঁড়া কঠিন,
আমরা যতবারই ভেবেছি 
আবিষ্কারের কথা,
মানুষ আবিষ্কার…
সে বিদ্যার চেয়ে নাকি 
জাদুকর হওয়া সহজ,
সবই তো ভ্রম,
শুধু ধারণা দেওয়া প্রয়োজন,
ভ্রমাণ্ডেও বিশ্বাস বিদ্যমান।

ও থাকতে আমরা কখনো অনাহারে থাকিনি,
বিপদ সংকেতের পূর্বেই সে খাড়া হওয়া
এক জওয়ান,
কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম,
ফুলের সুবাস যেমন ভ্রমর ডাকে,
ভ্রমরও থাকে এমনই ঘ্রাণের খোঁজে,
তারপর মাতোয়ারা 
পৃথিবী অতল…

ও ছোটো থেকে খেলাতে ভালো,
ভালোবেসে খেলে,
শুনেছি এক একসময় দিন-রাত খেলেছে টুর্নামেন্ট,
প্রশংসার যা কিছু 
তাই যদি না করি,
তবে ওটা নির্ঘাত মুর্খামি।
শুধু খেলা বললে
ও বলতেই পারে,
“পড়াশোনায় আমি কি তবে গোল্লা একেবারে?”
ও ভালো বলতে পারে,
তাই শ্রোতারা কর্নছত্র মেলে ধরে,
ওর যথেষ্ট দখল আছে, দলিত লিটারেচার-এ,
জেন্ডার স্টাডিজ-টা ভালো বোঝাতে পারে,
তাই তো ওরা বারে বারে ঘিরে ধরে,
সত্যি কিছু তো একটা ব্যাপার আছে,
যা আমরা আমরা খুঁজি রোজ,
ব্যর্থ যদিও বারে বারে,
মেঘের আড়ালে 
আকাশে সে কী আছে
একথা মেঘনাদ ব্যতিত কে ভালো বলতে পারে!

শিকড়

আজ তেইশ বছর লালন পালনের,
দেওয়া-নেওয়ার বিনিময়ে বন্ধুত্ব-প্রেম গড়ে উঠতে দেখেছি,
স্বার্থ নিহিত স্বজন দেখেছি।
আমার একমাত্র বিনিয়োগকারী 
নিঃস্বার্থ হিসেব-রক্ষক 
হিসেব চাননি কোনোদিন…

ছোটো ছিলাম যখন প্রতিটা থাপ্পড়, চাবুক ছিল ঘৃণ্য, 
ঘৃণ্য ছিল ওই মানুষটাও…
আমি আজ বুঝি, 
খুঁজি হারানো সেসব স্মৃতি,
বাবা কেন পড়তে বলে না আর…?!
বড়ো হয়েছি তো, তাই বুঝি!

দু'পয়সা কামিয়ে দেখেছি,
ভাঙ্গলে বড্ড লাগে,
রক্ত না'হোক ঘাম বেচেছি তো…
উনি বেচেছে রক্ত-ঘাম, নিরলস শ্রম,
নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানো,
নিজে না পরে অন্যকে পরানো,
‘বাবা’ মানেই তো ‘বলিদান’।

কেউ যেন বলেছিলো কোনোদিন,
সন্তান জন্ম দেওয়া সহজ,
‘বাবা’ হওয়া কঠিন।
যৌনালয়ে কত কত ভ্রণ হত্যা হয়, 
কিংবা জন্মায়,
সে-ও তো খোঁজে, স্কুলের মতোই, বাবার কী নাম…
বহিরাবরণে না'হয় মানুষ হলো,
মস্তিষ্ক না'হয় মেনে নিলো,
অন্তর পারবে কি?

আমরা ছোটো থেকেই বাবা পেয়েছি,
কোলে-কাঁধে চড়েছি,
বলেছি কখনো প্রকাশ্য-গোপনে ‘বাপটা মাতাল’, গালি-গালাজ, শারিরীক নির্যাতন করে…
রাস্তার ওরা, 
যাদের কপালে ‘অনাথ’ লেখা,
কিংবা একাকি সন্তান সামলানো ‘মা’,
পর-পুরুষ লুন্ঠনে ভালোবাসে,
সুযোগের সদ্ব্যবহার 
সহবাসে শান্তির নীড় ক্ষনিকের…

বীজ তো বপন হয়, 
গাছ বেড়ে ওঠে,
শিকড় ব্যতিত গাছ কি বাঁচে?

আড়ি

আমার তখন বয়স বছর কুড়ি কিংবা বাইশ,
সমুদ্রের মতোই উচ্ছসিত তারূণ্যের জোয়ার…
আমার লাজুক প্রকৃতির স্বভাব,
কখনও কল্পনাই করে ওঠেনি 
প্রেম নামক অসুখ শব্দটা…

বাড়ীর লোকে দেখেছে আশে-পাশে,
আমিই রয়েছি বুড়ি বয়সে,
লোকক্তি শুনে শুনে বাবা-মায়ে ঠিক করেছে 
বুড়িরে এবার বিয়ে দিতে হবে…
পড়াশোনা করতে তো বাধা নেই,
একবার বিয়ে দিলে চোখ দুটো তৃপ্তি পাবে,
কাঁধে যা ভার,
ওটাও কিছুটা লাঘব হবে,
এরপর যা কিছু তার সমস্ত বৃত্ত জুড়ে 
শ্বশুরবাড়িই কেন্দ্রস্থলে…

পরিণয়ের আজ বছর দুই প্রায়,
তবুও মুখ দুটো দুজনেরই বিপরীত পার্শ্বে…
যে ফরমান লাভ করেছিলাম বিবাহ নামক মৈত্রী সন্ধিতে,
আজ সন্ধি বিচ্ছেদে দু’জন দু’গোলার্ধে…
সিঁথিতে সিঁদুরই একমাত্র তোমার প্রতিচিহ্ন,
অঙ্গজুড়ে বরস-মাস মরুভূমি,
কেউই আসেনি মরুভ্রমণে…

নিঃশব্দে প্লাবণ আসে অক্ষিকোটরে,
হৃদয় গহীন হতে ডাক ওঠে -
ওগো! প্রিয় সখা, তোমার কি একটুও না মনে পড়ে,
প্রতি রজনী মোর অশ্রু ঝরে,
শুকনো বালিশ ভিজিয়া পড়ে,
আমারে ফেলিয়া এ মরুদ্যানে,
তুমি পাড়ি দিয়েছো ভিজিবার লাগি দ্বীপান্তরে…

শেঁকলের দাগ —হাতে-পায়ে-কোমরে

আমি যোগ্য-অযোগ্য’র খেলাটা আদতে বুঝিনা
তাই হতভম্ব হয়ে দেখি
আহারে রাজনীতি!

ওরা আপনাদের পাশে সহকর্মীরূপে ছিল এদ্দিন
কর্মযোগে মনে হয়নি লোকগুলো বেখাপ্পা?
প্রশ্ন করেননি কর্মকাণ্ড দেখে,
“আচ্ছা, আপনি চাকুরীটা পরীক্ষা দিয়ে পেয়েছেন?”
যেভাবে আমাদের শিক্ষক প্রায়শই আমাদের ব্যর্থতা দেখে
বলতেন,
“আচ্ছা, তুই কীভাবে ভর্তি হলি রে,
নিশ্চয়ই কোটা’র জাদু-তে?”

এতদিন এত ঝড়-ঝঞ্ঝাতেও
বেপাত্তা চিহ্নিত উত্তরপত্র 
এখন দেখি সামাজিক মাধ্যমে
 ভেসে বেড়াচ্ছে
রাশি রাশি যান্ত্রিক পাঠযোগ্য উত্তরপত্র…
সত্যি, বিচিত্র চিত্র…
যোগ্যরা মেলায় তাস ঠেকেতে
আর আমরা দু’গ্লাস মদ গিলতে গিলতে
বলি বন্ধুকে —
“আমরা কি যোগ্য ছিলাম না রে?
আমরা কি পারিনি পড়াতে ওদের মতো?
এক মূল্যায়ন আমরাকে অযোগ্য ঠাওরে দেয়,
ওর এত দম আছে!
ছেলে-মেয়েরা তবে জড়িয়ে ধরে কেন কাঁদিয়ে ছিল আমায়?
আমরা তো ওদের মতো পড়াই না –
অযোগ্যরা শুধু গল্পকথক, তাই না?”

নয়’টা বছর ওরা প্রমাণ করেছে যোগ্যতা
আর আমরা বুঝেই উঠতে পারিনি আমাদের নামের আদ্যক্ষর’টা…
ওরা দিয়েছে –
তাই তো কিনেছি ন্যায্যে
ওরা দিলেও দোষী নয়
আমি কিনেছি তাই সমাজের চোখে
আমি অপরাধী, অযোগ্য, অশিক্ষক…

এমনও দিন আসবে না তো —
প্রমাণ দিতে হবে
আমি মানুষ কি না!
সেই মূল্যায়নে হতে পারবো কি নির্বাচিত?
নাকি আবার প্রশ্ন ফিরবে কিনারায় —
যোগ্য-অযোগ্য
আমি ঠিক কোনটায়…

কারাগার

একদিকে শিল্প গড়ে ওঠে,
শিল্পী জন্মায় সারে সার…
অন্যদিকে শোধনাগার
কখনও গড়ে মানবিক প্রাণ,
কখনও আবার হিংস্র জানোয়ার।

মুক্ত বাতাসও বারুদ
মাখতে ভালোবাসে,
যেভাবে কুপিয়ে খুন করে আসামি
রক্ত মাখে মুখে-চোখে…
ওই কালোবন্ধনী 
যার প্রতিটা প্রাচীর সাক্ষী,
নিঃসঙ্গের সঙ্গী,
কত দোষী নির্দোষীর কথ্যলাপ…

উঁচু মাথার সম্মান সূর্যসম,
অর্থবল ভঙ্গুর করে দৃঢ় প্রত্যয়।
রাজসভায় রাজার দু’কথা,
নিভিয়ে দেয় কারো পৃথিবীর আলো।

নক্ষত্রপাত

আজ মেঘে ঢেকেছে গোটা আকাশ,
যেন অমাবস্যার গভীর রাত।
প্রতি ফোঁটা বৃষ্টিই যেন মনে হচ্ছে অশ্রুপাত…
নিঃশব্দেই যেন কেঁদে চলেছে কেউ,
পাশে আছি,
তবুও কয়েক ক্রোশ দূরে
অন্তর
অনুভূতি…

ওই যে তারা,
যে পথ চিনিয়েছে এদ্দিন,
তাঁকে খসতে দেখছি…
মানুষের মৃত্যুর তিন দিনে তিতে ভাত
মুখে নিয়ে 
নক্ষত্রখচিত আন্তরীক্ষে চেয়ে দেখেছি,
অত নক্ষত্রের ভীড়ে কে কোনটাকে খুঁজেছি 
বুঝেছি 
জানি না ঠিক…
তবুও বিশ্বাস সেথা ঠাঁই পেলে জন্নতলাভ।

যে চোখে দেখেছি আকাশ,
চিনেছি দিক,
কক্ষপথ থেকে ছিটকে গিয়েই
মৃত তারা,
উল্কাপাত…

প্রতিস্থাপিত হবে নিশ্চয়,
শূন্য পড়ে থাকে না কিছুই,
তবুও কি যথোচিত বিকল্প ব্রহ্মাণ্ড পাবে!

বুদ্ধিজীবী

বয়সটা তখন কম ছিল অনেক
তবে বুঝতাম কোনটা কী…
স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এসে পড়েছি
‘দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস্’,
তার দাবিদার বহুজন
এককে ধরলে
অন্যজন প্রশ্ন তুলবে,
শুধুই ও-ই কেন
আমরাও তো আছি!
দোষ যদি ধরা পড়ে
ওতে আমি ছিলাম না
ওরাই তো ছিলো কাছাকাছি…
খেলা-মেলায় মেতে উঠি
লোকেরা জানে আমরা খাঁটি
আসলে আমরা মাথা খাটাই
আসল খাটুনি ওরাই খাটে
মাথা যাদের নাই থাকে
আমরা ওদের বরাবর
ফেলি 
খাটিয়াতে
আমাদেরও তো খাটুনি আছে…!

সমাজের চতুর্দিকে 
কত শিক্ষিত মানুষ…
সু-শিক্ষিত
পুঁথিতে,
দর্শনশাস্ত্রে ডক্টরেট 
হয়তো খুঁড়েছে নতুন
জলের গভীরতা দারুণ…
তার মানে নৈতিকতাও ভরপুর!
ওরা মানুষের 
গভীরতা চেনে না
ওদের ইচ্ছে করে জানতে
উত্থান ঠিক কোথা থেকে
কোঠা থেকে কেউ উঠে এলে
জ্ঞানের শিখা 
নিভেই থাকে!
পূর্বধারণা
নয়তো
বিজ্ঞপ্তির কামাল
কোন গর্ভনিরোধক আবরণ
কেমন
কে পারে তার দীর্ঘায়ু 
বলে দিতে!

ছোটোতে 
তখন কনডম্ ফুলিয়েছি 
বেলুন ভেবে
প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে
দেখতাম কত কত ফেলে দিত
বৈধতার গন্ডি পেরোলে…
এখন ছেলে-মেয়েরা
দশ কিংবা পনেরো হলেই
ছুটে যায় ঔষধালয়ে
যেথা চেনা জানা 
কেউ থাকে
কনডমের দাবি রাখে
তারই কাছে
জিজ্ঞেস যদি করে,
“এ বয়সেও কনডম্ লাগে?”
“জানি না”
তবে প্রিয়া বলেছে,
“যদি না আনিস
ছুঁতে দেবো না তোকে,
পেট হয়ে গেলে এ বয়সে
এবরশন জ্বালা পারবো না সইতে
তুই কি জানবি এসব!
তুই তো জানিস ফেলে দিতে…”

হস্তমৈথুন নিয়ে বললে
লোকে ভ্রু কুঁচকে দেখে
হয়তো বক্ষযুগল
দেখলেও 
কেউ দেখে না অমন
আড়চোখে…
কেউ কেউ বলে ওঠে,
ছিঃ! ছিঃ!
কার কাজ নেই
এসব অকাজে…
মেয়েদের মতন
মেয়েদের সঙ্গে 
খুব একটা
মেলামেশা নেই…
যারা জানে সব
তবুও মানতে নারাজ
বুদ্ধিজীবী 
তারাই 
হয়তো
যারা লুকোতে জানে
সুকৌশলে
যারা তীর ছোঁড়ে 
তীরন্দাজ অর্জুন হয়ে
ভাবাঘাতে সুধার আনে
অমৃত সুধা
তাই বক্ষজুড়ে
বৃন্ত ফুটেছে পাঁপড়ি হয়ে …

রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫

ঝোঁক

বহু পরে পরে তুমি ফেরো
আবার ডুবে যাই…
তুমি কি জানতে
এত আসক্তি তোমাতে?

তুমি যখন আসতে
অভিযোগের পাহাড় নিয়ে
মান-অভিমান মেটাতে তখন
কতই কী হয়েছি 
                    ‌‌ আলোড়নে
তারপর সব মিটে গেলে
তুমি গিয়েছো নদী হয়ে
আমারই প্রান্তদেশে 
অরণ্য গহনে…

এখন সময়টা অতিক্রান্ত অনেক
শূন্যস্থান পূরণ করতে গিয়ে
দেখি
দীর্ঘ বিরতি শুধু
বেঁচেছি কম
বেচেছি বেশী
অবশেষে হলফনামা জারি
আমি অভিযুক্ত 
আসামী
নষ্ট করেছি নীড়
পক্ষীটির …

উন্মোচন

বৈবাহিক সংলাপ

অর্ধশতকের অর্ধেক বসন্ত পার হয়ে গেছে, মুখে তার ছাপ ভাসমান। তবে আধার ভিন্ন কথা বলে— ওখানে আমি এখনও তরুণ। ছোটোবেলায় বলতো বাবা-মায়ে, “কয়েক ব...

শীর্ষপাঠ